প্রাচীন শহরের বাইরে, এক পরিত্যক্ত গোরস্থানের ধারে অনেকদিন ধরেই অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটছিল। স্থানীয়রা বলত, রাতে সেখানে মৃত আত্মারা ঘুরে বেড়ায়। কোনো সময় গোরস্থানের মধ্যে হাসির শব্দ শোনা যেত, আবার কখনো কাঁদার আওয়াজ ভেসে আসত। কিন্তু এই গল্পগুলো ছিল শুধুই ভয়ের পুঁথি, কিছু বিশ্বাসযোগ্য নয়।
একদিন, বিক্রম নামে এক যুবক গোরস্থানে রাতের জন্য পাহারা দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। সে ছিল একেবারে সাহসী এবং এসব গল্পকথা তুচ্ছ মনে করত। “আসলে কিছু নেই,” সে মনে মনে ভাবছিল, “সবই কল্পনা।”
সেই রাতে, বিক্রম গোরস্থানের সামনে এসে পৌঁছাল। চারপাশে নীরবতা, যেন সময়ও থেমে আছে। গোরস্থানের মধ্যে অন্ধকার ছিল, শুধুমাত্র চাঁদের আলো কিছু কিছু পাথরের উপর পড়ছিল। তার পকেটে একটি টর্চলাইট ছিল, কিন্তু তাকে খুব বেশি প্রয়োজন পড়েনি—কারণ চারপাশে কোনও এক অদ্ভুত শীতলতা ছিল, যা তার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে উঠাচ্ছিল।
কিছু সময় পর, বিক্রম ঠিক করে বসে পড়ল। হঠাৎই সে শুনতে পেল, গোরস্থানের ভিতর থেকে কিছু একটা গড়াগড়ি করার শব্দ আসছে। তার চোখ সরু হয়ে গেল, টর্চের আলো দুলে উঠল। আবার সেই শব্দ, এবার পরিষ্কার—কেউ যেন আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে।
বিক্রম ভয় পেল না, কিন্তু তার মনটা অস্থির হয়ে উঠল। সে দাঁড়িয়ে টর্চের আলো দিয়ে গোরস্থানের ভেতরটুকু ভাল করে দেখল। ঠিক তখনই, সোজা সামনে, তাকে দেখে দাঁড়িয়ে ছিল এক অদ্ভুত দৃশ্য—একটি কালো ছায়া, চোখ দুটি সাদা হয়ে জ্বলছিল।
বিক্রম ভয় পেয়ে প্রায় পিছিয়ে গেল। কিন্তু ঠিক তখন, তাকে সেই ছায়াটি কিছু বলল—“তুমি কি ভাবছ, আমাদের চলে যাওয়ার পর আমরা কোথায় চলে যাই? আমরা কি কোনোদিনই দূরে চলে যেতে পারি?”
বিক্রম চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল, কিছু বলতে পারছিল না। সে চোখে দেখল, আরো কিছু শাদা ছায়া গোরস্থানের গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে, কেউ হাসছে, কেউ কাঁদছে। মৃত্যুর পরও তারা ছিল, আর বিক্রম বুঝতে পারল, তারা আসলে কতটা কাছাকাছি।
তার পর থেকে বিক্রম আর কখনো ওই গোরস্থানে রাত কাটানোর সাহস করেনি। সে জানত, মৃতদের সঙ্গ কখনোই মিথ্যে নয়, তারা শুধু অদৃশ্য রূপে আমাদের পাশে থাকে, সবসময়।
