ছায়ায় ঢাকা নদী

পশ্চিম মাধবপুর গ্রামের পাশে প্রবাহিত ছিল একটি সরু নদী, যার নাম কালীস্রোত। দিনের বেলায় নদীটি দেখতে একেবারে শান্ত, কিন্তু রাত নামলেই সেই নদীকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়ত ভয়ানক গল্প। শোনা যেত, রাতে কেউ সেখানে স্নান করতে গেলে আর ফিরে আসেনি।

রাহুল, গ্রামেরই এক কৌতূহলী তরুণ, এসব গল্পকে মিথ্যে বলে মনে করত। সে ঠিক করল, সত্যি ঘটনা জানতে নিজেই এক রাতে নদীর ধারে যাবে। গ্রামের প্রবীণরা তাকে বারবার সতর্ক করল, কিন্তু সে কারও কথা শুনল না।

এক অমাবস্যার রাতে, রাহুল টর্চ আর একটি লাঠি নিয়ে নদীর দিকে রওনা দিল। চারদিকে অন্ধকার আর নিশুতি রাতের নিস্তব্ধতা। নদীর ধারে পৌঁছে সে দেখতে পেল, চাঁদের আলো না থাকায় পুরো নদীটি যেন ছায়ার চাদরে ঢাকা।

রাহুল নদীর পাশে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকাল। সবকিছু স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। সে ভাবল, “এসব নিছক গল্প। কোনো অভিশাপ নেই।” সাহস করে সে নদীর শীতল জলে পা ডুবিয়ে বসল। হঠাৎই সে অনুভব করল, তার পায়ের চারপাশে কিছু যেন নড়াচড়া করছে।

রাহুল দ্রুত উঠে দাঁড়াল। তখনই দেখল, নদীর জলে এক অদ্ভুত ছায়ামূর্তি। সেই মূর্তি ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছিল। মূর্তির শরীর মানুষের মতো, কিন্তু মুখ ছিল অস্বাভাবিক লম্বা আর চোখ দুটি লালচে।

মূর্তিটি রাহুলকে লক্ষ্য করে বলল, “তুই কেন এসেছিস? এখানে তোর জায়গা নেই!” রাহুল ভয়ে পিছিয়ে যেতে লাগল। মূর্তিটি এবার জলের নিচ থেকে দীর্ঘ হাত বাড়িয়ে তাকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করল।

রাহুল প্রাণপণে দৌড় লাগাল। নদীর পাড়ে ছুটতে ছুটতে পেছনে তাকিয়ে দেখল, সেই ছায়ামূর্তি নদীর জলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেছে। কিন্তু তার ভয়াবহ চোখদুটো এখনো অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছে।

কোনোমতে গ্রামে ফিরে এসে রাহুল সবাইকে ঘটনা বলল। গ্রামের প্রবীণরা জানাল, অনেক বছর আগে কালীস্রোতে ডুবে এক ব্রাহ্মণ যুবক মারা গিয়েছিল। সেই যুবকের আত্মাই নাকি নদীটিকে অভিশপ্ত করে রেখেছে।

সেই রাতের পর থেকে রাহুল আর কখনো কালীস্রোতের ধারে যায়নি। নদীটি এখনো ছায়ায় ঢাকা থাকে, তার সঙ্গে অজানা রহস্য আর ভয় মিশে।