রামকিশোর বাবু গ্রামের একসময়ের প্রভাবশালী জমিদার ছিলেন। তার বয়স এখন সত্তরের কাছাকাছি। জীবনের সায়াহ্নে এসে তিনি সম্পদের মোহ ত্যাগ করলেও তার অতীতের একটি ঘটনা বারবার তার মনে কাঁটার মতো বিঁধত।
তখন রামকিশোর বাবু ছিলেন বিশ বছরের এক উচ্ছৃঙ্খল যুবক। তার গ্রামের দরিদ্র কৃষক হরিদাস একবার তার জমির কর মওকুফের আবেদন জানায়। কিন্তু রামকিশোর বাবু অহংকারবশত তাকে অপমান করে এবং তার জমি কেড়ে নিয়ে হরিদাসকে গ্রামছাড়া করেন। অপমানে ও দারিদ্র্যে হরিদাস এবং তার পরিবার আত্মহত্যা করে।
এই ঘটনার প্রায় পঞ্চাশ বছর পরের কথা। এক রাতে রামকিশোর বাবু তার দোতলার ঘরে বসে ছিলেন। হঠাৎ তিনি দেখতে পেলেন জানালার বাইরে একটি অদ্ভুত ছায়ামূর্তি। সেই ছায়া স্থির দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু তার চোখ ছিল জ্বলজ্বলে। তার মনের ভেতর অজানা আতঙ্ক দানা বাঁধল।
“কে ওখানে?” তিনি কাঁপা গলায় প্রশ্ন করলেন।
কোনো উত্তর এল না। ছায়ামূর্তিটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এল এবং জানালার কাঁচের ওপর হাত রাখল। কাঁচের ওপারে সেই হাতের রেখাগুলি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল, যেন জীবন্ত কিছু। রামকিশোর বাবু আতঙ্কে চিৎকার করতে গিয়েও গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের করতে পারলেন না।
তখন সেই ছায়ামূর্তি কথা বলল। তার গলা ভারী ও গভীর। “আমাকে চিনতে পেরেছিস, জমিদার? আমি হরিদাস। তোর লোভ আর পাপের জন্য আমার পরিবারকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। এখন তোর পালা।”
রামকিশোর বাবু কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “আমি ভুল করেছি, আমাকে ক্ষমা করে দাও।”
ছায়ামূর্তি বলল, “ক্ষমা? পঞ্চাশ বছর ধরে আমি আর আমার পরিবার শান্তি পাইনি। তুইও পাবি না।”
এ কথা বলেই মূর্তিটি হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেল। কিন্তু সেই রাত থেকে রামকিশোর বাবুর জীবনে শুরু হয় ভয়ংকর অভিশাপ। তিনি প্রতিদিন রাতে সেই ছায়ামূর্তিকে দেখতে পেতেন, এবং প্রতিবারই তা আরও কাছাকাছি আসত। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।
শেষমেশ একদিন সকালে তার নিথর দেহ পাওয়া যায়। গ্রামের মানুষ বলে, রামকিশোর বাবু মারা যাওয়ার সময় তার মুখ ছিল ভয় ও আতঙ্কে বিকৃত। আর তার ঘরের দেওয়ালে লেখা ছিল এক লাল অক্ষরের বাক্য—“পাপের শাস্তি থেকে কেউ রেহাই পায় না।”
